May 07 2023 0 Comment
by Admin May 07 2023
যশোর এর যশ
খেজুরের রস। কথায় আছে-
নানান রঙের ফুলের মেলা,
খেজুর গুড়ের জন্য যশোর জেলা বিখ্যাত। পাশাপাশি
ফুলের রাজ্যখ্যাত গদখালি এই যশোর জেলায়
ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে গাছিরা ও ফুল চাষিরা
তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না, যেটা
তাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে বাঁধা
হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে
যশোর জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বিস্তৃতি এবং গাছি ও ফুল চাষিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট
এন্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বেডস) এবং জাপান এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন ফোরাম (জীফ)-এর
উদ্যোগে একটি জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়
চাষিদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ
গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত মোট ১৩৫ জন (গাছি, ফুল চাষি এবং হস্তশিল্পী)
সদস্য নিয়ে "যশোর জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিঃ" গঠিত
হয়েছে। সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাপানি এনজিও অনুদান সহায়ক প্রকল্পের অর্থায়নে
একটি অফিস ভবন স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত অফিসটি সর্বত্র "গাছি বাড়ি" নামে পরিচিতি
পাচ্ছে। গাছি বাড়ি একটি কেন্দ্রীয় স্থান, যেখান থেকে সমবায় সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত
হয়। এটি একটি বহুমুখী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। যেখানে রয়েছে- গুড় উৎপাদন কেন্দ্র,
মোড়কীকরণ সুবিধার জন্য সুবিশাল ঘর, সমবায় পণ্য বিক্রির জন্য এগ্রো গ্রীনশপ নামে একটি
বিক্রয় ও পণ্য পরিদর্শনের কেন্দ্র, সমবায় সমিতির সদস্যদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার
জন্য সুবিশাল অফিস কক্ষ, সদস্যদের সভা ও প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য কনফারেন্স রুম, উৎপাদিত
পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য একটি পরীক্ষাগার, সমবায়ভিত্তিক খেজুর চারার নার্সারি,
দর্শনার্থীদের জন্য নির্মাণাধীন রয়েছে মনোরম কটেজ। এ প্রকল্পের আওতায়
সমবায় সমিতি সদস্যরা সমিতি পরিচালনার উদ্দেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে
উল্লেখযোগ্য: সাংগঠনিক ক্ষমতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং সমবায় ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা
বিষয়ক প্রশিক্ষণ। খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক সমবায় অফিস ও যশোর জেলা সমবায় কর্মকর্তার মাধ্যমে
তারা এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের সাংগঠনিক ক্ষমতার উন্নয়ন
পরিলক্ষিত হয়েছে। বর্তমানে সদস্যরা নিজেদের মিটিং এবং কর্মসভা নিজেরাই পরিচালনা করে
থাকেন। এছাড়া সমবায় সমিতির সদস্যদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিতকরণ, বৈচিত্র্যময়
পণ্যের, মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে নানাবিধ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রদান করা হয়। এর
মধ্যে উল্লেখযোগ্য: খেজুর রস সংগ্রহকারীদের-
খেজুর গুড় ও গুড়জাত পণ্য প্রস্তুতকরণ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, এবং খেজুর গুড়ের মোড়কীকরণ
ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এছাড়া ফুল চাষিদের- মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা, জৈব পদ্ধতিতে ফুলের
চাষ, ফুলের মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি, হস্তশিল্পীদের- বৈচিত্র্যময়
পণ্যের উৎপাদন, মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ। উক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
সমবায় সমিতির সকল সদস্যরা পূর্বের তুলনায় তাদের পণ্যের গুণগতমান, মোড়কীকরণ ও বাজারজাতকরণ
মান উন্নত করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তারা তাদের উৎপাদিত সমবায় পণ্য ব্র্যান্ড হিসাবে
বাজারে বিপণন করছেন। সমবায় সদস্যরা বর্তমানে নিজেদের পণ্যের উৎপাদন, মোড়কীকরণ, প্রচার- প্রচারণা,
বাজারজাতকরণ নিজেরাই করে থাকেন। এতে করে একদিকে যেমন তাদের সমবায় পণ্য সর্বত্র ব্র্যান্ড
হিসাবে সমাদৃত হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যতিরেকে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য
সরাসরি নিজেরাই পাচ্ছেন। পাশাপাশি সদস্যরা সমবায়ভিত্তিক জৈব ফুল বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এছাড়া সমবায় পণ্য খেজুর গুড় বর্তমানে গাছি গুড় নামে
বাজারে ব্যাপক পরিচিতি পাচ্ছে। তাদের উৎপাদিত এসকল পণ্যের প্রচার প্রসারতা ঘটাতে প্রকল্পের
সহায়তায় সমবায় সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের লিফলেট, পোস্টার তৈরি করেছেন। এবং পণ্যের প্রচারণার
উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন ও মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এ ধরনের কার্যক্রম
তাদের সমবায় পণ্যের বিস্তার ঘটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ সমিতির উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে
রয়েছে খেজুর গুড় (যেটা গাছি গুড় নামে পরিচিত), খেজুরের পাটালি, গুড়ের মোয়া, খেজুর গুড়ের
বাদাম পাটালি সহ খেজুর গুড়ের তৈরি আরও বিভিন্ন ধরনের উৎপাদিত পণ্যের পাশাপাশি গদখালি
এলাকায় সমবায় পণ্যের মধ্যে অন্যতম
প্রধান আকর্ষণ হল ফুলের পণ্যসমূহ। যেমনঃ ফুলের তৈরি সুগন্ধি তেল, ফুলের সাবান, ফুলের ডাই দিয়ে তৈরি জামা এবং শাড়ি। এছাড়া আরো আছে রেসিন ও প্রাকৃতিক ফুলের সংমিশ্রণে তৈরিকৃত চাবির রিং, কানের দুল, চিরুনি, চুড়ি, ওয়েট পেপার ইত্যাদি। এর পাশাপাশি সদস্যরা খেজুর পাতা দিয়ে নানাবিধ উপকরণ তৈরি করে থাকে। উৎপাদিত এসকল পণ্য তারা সরাসরি দোকানে এবং ক্রেতার কাছে বেশি দামে বিক্রি করে থাকেন। যা সমবায়ীদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
সমবায়
পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সদস্যরা ফুলের উপজাত পণ্যের (ফুল ও তেলের) পরীক্ষা করিয়েছেন।
উক্ত পরীক্ষাটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বীকৃত। যা ক্রেতার সন্তুষ্টি
ও পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে ও বাজারজাতকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
সমবায়
সদস্যরা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দল সভা, ছোট সভা, এলাকাভিত্তিক সভা এবং জ্ঞান
ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা পরিচালনা করে থাকে। এতে একদিকে যেমন সদস্যদের মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধি
হয়, অন্যদিকে সদস্যদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দৃঢ় হয়। এধরনের কর্মকান্ড সমবায় সমিতির জন্য
ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
এছাড়া
সমবায় সদস্যরা বিকল্প আয়ের কথা বিবেচনা করে সমবায়ভিত্তিক খেজুর চারার নার্সারি এবং
ফুলের নার্সারি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই নার্সারির প্রচার প্রচারণা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সদস্যরা
প্রকল্পের সহায়তায় বিভিন্ন ধরনের লিফলেট তৈরি করে তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে
তাদের তৈরিকৃত নার্সারি থেকে চারা বিক্রির হার পেয়েছে।
এই
নার্সারি থেকে চারা বিক্রির মাধ্যমে সমবায় সমিতির সদস্যরা বিকল্প আয় করতে পারছেন। যা
তাদের জীবনযাত্রার মানকে আরো উন্নত ও গতিশীল করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
সমবায়ভিত্তিক জৈব পদ্ধতিতে ফুল চাষের উদ্দেশ্যে সদস্যরা বর্তমানে ভার্মি উৎপাদন শুরু করেছেন। এর ফলে তাদের উৎপাদিত ফুলের ইনপুট খরচ পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে এবং ফুল উৎপাদন বেড়ে গেছে। সদস্যরা ফুলের বাগানের পাশাপাশি সমন্বিত সবজি চাষ করছে। এতে একদিকে যেমন তাদের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হচ্ছে।
গদখালিতে সমবায় সদস্য কর্তৃক কৃষি পর্যটনের সূচনা করা হয়। যেখানে সদস্যরা নিজ ফুল বাগানে সমবায়ভিত্তিক কৃষি পর্যটন পরিচালনা করে থাকে। এই উদ্ভাবনার মধ্যে রয়েছে দর্শনার্থীদেরকে পরিবেশ সংরক্ষণ করার সঠিক জ্ঞান বিনিময়, বাগানে উৎপাদিত ফুলের জীবন-ইতিহাস বর্ণনা করা, ফুলের উৎপাদন কৌশল বর্ণনা করা এবং ছবি তোলার সুব্যবস্থা। এ ধরনের নতুন উদ্ভাবনা সমবায় সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সমবায়
সমিতির সদস্যদের একটি সংগঠিত পরিচয় তৈরি করার পাশাপাশি সমিতির যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক
কার্যক্রম পরিচালনা করা, সদস্যদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি করা, পণ্যের ব্র্যান্ডিং
ও পরিচিতি বৃদ্ধি করা, পণ্যের সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় করা,
পর্যটক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি বৃদ্ধি
করা, স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে ভূমিকা রাখা এই সমিতির মুখ্য উদ্দেশ্য।
যশোর জেলার গাছি ও ফুল চাষিদের জীবনমান উন্নয়নে একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে এ জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিঃ এবং তাদের এই গাছি বাড়ি। এটি শুধুমাত্র একটি সংগঠন এবং স্থাপনা নয়, বরং একটি সমন্বিত কেন্দ্র যা ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদন, বিপণন এবং সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। পরিশেষে বলাবাহুল্য যে বাস্তবায়িত প্রকল্পের কার্যক্রম শুধুমাত্র সমবায় সমিতির সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নেই নয়, বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণে এবং টেকসই উন্নয়ন এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
সমবায় শক্তি, সমবায়ই মুক্তি
মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান: জেলা সমবায় কর্মকর্তা যশোর।
তথ্যসূত্র
১.
যশোর জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড
২.
বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বেডস)
৩.
জাপান এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন ফোরাম (জীফ)
comment 0
Be a first one to comment!